বাংলাদেশের ক্রিকেটে উজ্জ্বল নক্ষত্র
তিনি। তিনি টিম টাইগারের দলপতি। বলছি, মাশরাফি বিন মর্তুজার কথা। চলুন
লড়াকু এই বীরের জীবনকে একনজরে দেখে নেয়া যাক।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক প্রথমের শুরু
যার হাত ধরে, যিনি অনেক অনেক সাফল্যের রূপকার- সেই মাশরাফি বিন মর্তুজার আজ
৩৬তম জন্মদিন। একে একে ৩৬টি বসন্ত পার করে শুরু করলেন ৩৭তমটি। ১৯৮৩ সালের ৫
অক্টোবর নড়াইলে জন্ম, বেড়ে ওঠা চিত্রা নদীর পাড়েই।
মাশরাফি বিন মুর্তজা একজন বাংলাদেশি
ক্রিকেট খেলোয়াড় ও সংসদ সদস্য। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অন্যতম বোলিং
স্তম্ভ ও একদিনের আন্তর্জাতিকে দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
ডানহাতি পেস বোলিংয়ের পাশাপাশি তিনি ব্যাটিংও করেন ডানহাতে। বাংলাদেশের
ইতিহাসের সর্বকালের সেরা পেস বলার ও সেরা অধিনায়ক তিনি।
মাশরাফির পিতামাতা
মাশরাফির বাবার নাম গোলাম মর্তুজা, তিনি
বর্তমানে ব্যবসায়ী। আর মায়ের নাম হামিদা মর্তুজা, তিনি গৃহিনী। মাশরাফিকে
তার মা-বাবা কৌশিক বলে ডাকে। এ নামেই পরিবারে পরিচিত তিনি।
মাশরাফির শৈশবকাল
ছোটবেলা থেকেই খেলাধূলার প্রতি আগ্রহী
ছিলেন মাশরাফি। তাদের বাড়ির পাশেই ছিল স্কুল মাঠ। বড়রা সে মাঠে ক্রিকেট
খেলতেন। স্কুলের মাঠে বড়দের ক্রিকেট খেলা দেখে দেখে মাশরাফির ক্রিকেটের
প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয়। উইকেট কিপারের পাশে মাশরাফি দাঁড়িয়ে থাকতো। কিন্তু
আহত হবে ভেবে বড়রা তাকে সরিয়ে দিত। উইকেট কিপারের পাশে দাঁড়িয়ে যেতে চায়।
বড়রা সেখান থেকে তাকে সরিয়ে দিলে তার মন খারাপ হয়। কিন্তু যার ক্রিকেট নিয়ে
এত আগ্রহ তাকে তো কেউ আটকে রাখতে পারেনা। মাশরাফিকেও পারেনি।
যাদের অনুপ্রেরণায় ক্রিকেটার হওয়া
নব্বইয়ের দশকে নড়াইলের ক্রিকেটার-সংগঠক
শরীফ মোহাম্মদ হোসেন উঠতি তরুণদের যত্ন নিতেন। তিনি মাত্র ১১ বছর বয়সের
মাশরাফিকে তার ক্লাব নড়াইল ক্রিকেট ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন। এ সময়
থেকেই মাশরাফির গতি দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে শুরু করে। ১৯৯১-এর দিকে মাগুরায়
বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ ক্যাম্পের বিকেএসপি কোচ বাপ্পির সান্নিধ্যে এসে
বোলিংয়ের অনেক মৌলিক বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হন। পরের বছর জাতীয় কোচ ওসমান খান
নড়াইলে এক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালাচ্ছিলেন। ওই সময় মাশরাফির আমন্ত্রণ আসে
খুলনায় খেলার জন্য। খুলনায় তার গতি ও সুইং হইচই ফেলে দেয়। সেই সূত্রে খুলনা
বিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে সুযোগ এবং ঢাকায় আসা।
পরবর্তীতে সুযোগ পান জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯
দলে। সেসময় তার বোলিং কোচ অ্যান্ডি রবার্টসের পরিচর্যায় পাল্টে যান
মাশরাফি। অনুর্ধ ১৯ দলে থাকতে মাশরাফি দারুন পারফরম্যান্সের কারণে
জিম্বাবুয়ে দলের বিরুদ্ধে ‘এ’ দলের খেলায় তিনি সুযোগ পান। এ নিয়ে সমালোচনা
হয়। কারণ মাশরাফি ঢাকার কোনো সিনিয়র ডিভিশন লীগেও খেলেননি। তবে সমালোচকদের
মোক্ষম জবার বলিংয়ের মাধ্যমে দিয়েছিলেন মাশরাফি। সেই সিরিজে মাশরাফি এক
ম্যাচে চার উইকেট নিয়েছিলেন। এরপর নিউজিল্যান্ড সফরে গিয়ে তার নাম হয়ে যায়
‘নড়াইল এক্সপ্রেস’। এরপর আর ইনজুরি ছাড়া আর কেউ মাশরাফি বিন মর্তুজাকে
আটকাতে পারেনি।
শিক্ষাজীবন
পড়ালেখায়ও ভালো ছিলেন মাশরাফি। তার
শিক্ষাজীবন শুরু হয় নড়াইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। নড়াইল সরকারী উচ্চ
বিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করেন নড়াইল
ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ২০০৩ সালে। এরপর দর্শন শাস্ত্রে অনার্স কোর্সে ভর্তি
হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ক্রিকেটের ব্যস্ততার কারণে তার
একাডেমিক পড়াশুনা শেষ করা হয়নি।
প্রিন্স অব হার্টস
দেশের কৃতি এই ক্রিকেটারকে সবাই বাইক
প্রিয় এবং হাসিখুশি ও উদারচেতা মানুষ হিসেবেই জানে। নিজের শহরে তিনি
প্রচণ্ড রকমের জনপ্রিয়। এখানে তাকে ‘প্রিন্স অব হার্টস’ বলা হয়।
দাম্পত্য জীবন
ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ার সময় সুমনা হক
সুমির সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ২০০৬ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মাশরাফি ও সুমি দম্পত্তি বর্তমানে দুই সন্তানের জনক। সন্তান- মেয়ে: হুমায়রা
মর্তুজা, ছেলে: সাহেল মর্তুজা।
মাশরাফিকে নিয়ে লেখা বই
বাংলাদেশের ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন
মর্তুজার জীবনী গ্রন্থের লেখক দেবব্রত মুখোপাধ্যায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন
মাশরাফি নিজেই উত্থান-পতনের এক রোমাঞ্চকর গল্প।
তিনি বলেন, জীবনে কিছু অর্জনের জন্য যারা লড়াই করে ক্লান্ত বোধ করছেন, মাশরাফির কাহিনী তাদের সাহস যোগাবে।
তিনি বলেন, জীবনে কিছু অর্জনের জন্য যারা লড়াই করে ক্লান্ত বোধ করছেন, মাশরাফির কাহিনী তাদের সাহস যোগাবে।
কেন তিনি মাশরাফির জীবন কাহিনী লিখতে
উৎসাহিত হলেন – এই প্রশ্নে লেখক-সাংবাদিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, কোনও
মানুষের এরকম নাটকীয় রোমাঞ্চর গল্প বিরল। আপনি অনেকের জীবনে সংগ্রাম খুঁজে
পাবেন, কিন্তু বার বার লড়াই এবং সংগ্রাম করে শিখরে ওঠার গল্প খুব কম।
একটা সময় গেছে যখন মাশরাফি ক্রিকেট থেকেই ছিটকে গিয়েছিল, কিন্তু সে ফিরে
এসেছে এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ভিন্ন এক মাত্রায় নিয়ে গেছে। এই জীবন
উত্থান পতনের এক রোমাঞ্চকর গল্প। যারা জীবনে কিছু অর্জনের জন্য লড়াই করে
ক্লান্ত হচ্ছেন, মাশরাফির জীবন কাহিনী তাদের উজ্জীবিত করবে।
মাশরাফি সম্পর্কে কি এমন তিনি তার বইতে
লিখেছেন, যা মানুষ জানতো না — এই প্রশ্নে দেবব্রত মুখোপাধ্যায় মন্তব্য
করেন, মাশরাফি একটি খোলা বইয়ের মত।
মজার ব্যাপার হলো, ২০১৪ সালের এইদিনে
অর্থাৎ ৫ অক্টোবর তারিখে পৃথিবীতে এসেছে মাশরাফির দ্বিতীয় সন্তান পুত্র
সাহিল মর্তুজা। তাই আজ মাশরাফিপুত্র সাহিলের ৫ম জন্মদিন। মানবকণ্ঠের পক্ষ
থেকে বাবা-পুত্রকে জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা।


0 Comments