এরপর গ্রেফতার কে

ক্যাসিনো, দুর্নীতি, দখল ও চাঁদাবাজিবিরোধী চলমান সাঁড়াশি অভিযানে একের পর এক ধরা পড়ছে ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙিয়ে টাকার পাহাড় বনে যাওয়া কথিত নেতারা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে রয়েছেন আরো অন্তত দুই ডজন ব্যক্তি। একই অভিযোগে এরপর কে গ্রেফতার হচ্ছেন এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে কানাঘুষা চলছে।
পিয়ন থেকে যুবলীগ নেতা (বহিষ্কৃত) বনে যাওয়া কাজী আনিসুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার ও আদাবর এলাকার ডিএনসিসি ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসুর নাম গ্রেফতার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে যে কেউ শিগগিরই গ্রেফতার হতে পারেন। তবে নজরদারিতে থাকা অনেকেই দেশত্যাগের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়।
সূত্র বলছে, চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর অবৈধ ক্যাসিনো কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নাম বেরিয়ে এসেছে কাজী আনিস ও মোল্লা মো. আবু কাওসারের। মাত্র ৭ বছরে কয়েক শ’ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান। ক্যাসিনো ছাড়াও কমিটি বাণিজ্য করে বহু টাকা কামিয়েছেন আনিস।
রাজধানীর ধানমণ্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি ফ্ল্যাট আর ১০টি দোকান আছে তার। আর বিপুল পরিমাণ টাকাসহ গ্রেফতার ঠিকাদার ও যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীমের ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন গতকাল অব্যাহতি পাওয়া কাওসার। একচেটিয়া গণপূর্ত বিভাগের কাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণে জি কে শামীমকে সহযোগিতা করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া ক্যাসিনো কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ যে কয়জনের নামে রয়েছে, তার একজন ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সভাপতি এই মোল্লা কাওসার। ইতোমধ্যে তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানীর আদাবর-শ্যামলী এলাকায় অনেকের প্লট, বাড়ি-ফ্ল্যাট, জমি জোর করে দখলসহ অন্তত ৩০টি অভিযোগ রয়েছে আদাবরের কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসুর বিরুদ্ধে। এসব ছাড়াও তার অবৈধ দখলের তালিকায় রয়েছে সরকারের খাসজমি, ফুটপাত, এমনকি সড়ক পর্যন্ত। এ ছাড়া এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মদত দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রগুলো বলছে, অবৈধ ক্যাসিনো কারবার, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের মাঠ পর্যায়ের নেতা ও বেশ কয়েক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে গ্রেফতার তালিকায় করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত হাতে নিয়েই শিগগিরই আরো কয়েকজন গ্রেফতার হবেন।
যুবলীগ সূত্রে জানা গেছে, কাজী আনিস কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যালয়ে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন ২০০৫ সালে। বেতন ছিল মাসে ৫ হাজার টাকা। সাত বছর পর ২০১২ সালে বনে যান কেন্দ্রীয় যুবলীগের দফতর সম্পাদক। যুবলীগের সবশেষ কমিটিতে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদ দেন সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব। কাজী আনিস আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। তিনি এখন একাধিক গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমির মালিক। আত্মগোপনে যাওয়ার আগে কোটিপতি আনিস যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক ছাড়া কাউকে পরোয়া করতেন না।
একাধিক নেতাকর্মীরা জানান, জি কে শামীম, খালেদসহ কয়েকজনের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়েন আনিসুর। তার সিন্ডিকেট চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্লাবে জুয়ার আসর চালানোসহ সব অপকর্মে জড়িত। যুবলীগে আনিসুর ‘ক্যাশিয়ার’ নামেই পরিচিত। চাঁদার টাকা সংগ্রহ এবং বিভিন্ন মহলে পৌঁছানোর কাজ করেন তিনি।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ধানমণ্ডি ১৫ নম্বর সড়কে প্রায় আড়াই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট আছে আনিসের। তবে ওই ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন না। বর্তমানে রাজধানীর ধানমণ্ডির ১০/এ সড়কের একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে থাকেন কাজী আনিস। ওই ফ্ল্যাটটিও তার নিজের। শুধু তাই নয়, গোপালগঞ্জে আনিসের রয়েছে বিপুল স্থাবর সম্পত্তি। আগে পাঁচ-ছয় বিঘা জমি ছিল তাদের। গত চার বছরে কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন। বাড়ি করেছেন, পেট্রল পাম্প এবং তার পাশের জমি কিনেছেন। এর মধ্যে পেট্রল পাম্পটি কিনতে কোটি টাকা লেগেছে আনিসের। পাশেই ৩ একর জমিও কিনেছেন এই কথিত নেতা। শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সম্প্রতি যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। কিছু আগ থেকেই আনিস আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর মতিঝিলে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে মদ, নগদ টাকা এবং ক্যাসিনোর সরঞ্জাম জব্দ করে মোল্লা কাওসার ছিলেন এ ক্লাবের সভাপতি। যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারি ব্যবসা চালিয়ে আসা জি কে শামীমের সঙ্গেও সখ্যতা ছিল মোল্লা কাওসারের। ক্যাসিনো ও ঠিকাদারির কমিশন থেকে কোটি কোটি টাকা কামানো অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কয়েকদিন আগে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল ইতোমধ্যে কাওসার ও তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দেরও নির্দেশ দিয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা যায়, একচেটিয়া গণপূর্ত বিভাগের কাজের দরপত্র নিয়ন্ত্রণে জিকে শামীমকে সহযোগিতা করার অভিযোগ আছে মোল্লা কাওসারের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনের মামলায় রিমান্ড শুনানির জন্য ২ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় আদালতে নেয়া হলে মোল্লা কাওসারের খোঁজ করেন জি কে শামীম। তার আইনজীবীদের কাছে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘মোল্লা কাওসার কোথায়? তিনি আসেন নাই?’ ওই সময় একজন উত্তর দেন, ‘উনি তো নিজেই দৌড়ের ওপরে আছেন। উনি কী করে আসবেন!’ নানা বির্তর্কের পর গতকাল সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি মোল্লা কাওসারকে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত দুই যুগে অন্তত অর্ধশত প্লট ও ফ্ল্যাট দখল করার অভিযোগ রয়েছে ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু ও তার ভাই আবুল কাসেম কাসুর বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নতুন ভবন নির্মাণকারীর কাছ থেকে চাঁদা, দোকান ও অফিস থেকে মাসোহারা নেয়া, মাদক কারবারে মদত দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর হাসুর বিরুদ্ধে। জানা গেছে, নব্বই এর দশকে হাসু-কাসুরা বসবাস করতেন আগারগাঁও বস্তিতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদকে। পাঁচ মাস চিকিত্সা শেষে সুস্থ হন তিনি। হামলার পর রিয়াজের পরিবার হাসু-কাসুসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেনকেও কুপিয়ে জখম করেছিল হাসুর লোকজন। এ ছাড়া আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রুবেলকেও পিটিয়ে আহত করে হাসুর ক্যাডার বাহিনী। তবে তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু।
৭ দিনের রিমান্ডে খালেদ : রাজধানীর খিলগাঁও থানার একটি হত্যা মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে পুলিশ।
এ সময় খিলগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে মামলার তদন্ত সংস্থা পিবিআই। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পি?বিআইয়ের তদন্ত চলাকালেই খা?লেদকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখা?নোপূর্বক রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত গ্রেফতার আদেশসহ সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা ইসরাইল হোসেন ও তার ছেলে সায়মন ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রাজধানী মানি এক্সচেঞ্জ থে?কে ৩৮ লাখ টাকা তোলেন। পরে গাড়িতে করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে খিলগাঁও থানাধীন তরাগাছ এলাকায় গাড়ি থেকে নাম?লে তিন-চারজন ছিনতাইকারী তাদের গুলি করে টাকার দুটি ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ সময় গুলিবিদ্ধ বাবা-ছেলেকে স্থানীয় খিদমাহ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওইদিন সেখানেই সায়মনের মৃত্যু হয়। পরে ইসরাইল?কে রাজধানীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে (পঙ্গু) নেয়া হয়। এই আঘা?তের জেরেই তিনি ২০১৬ সালে মারা যান।
এ ঘটনায় সায়মনের চাচা মজিবুর রহমান ২০১৪ সা?লের ৫ সে?প্টেম্বর বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় দণ্ডবিধির ৩০২, ৩৯৪ ও ৩৪ ধারায় একটি মামলা করেন। ওই মামলার আসামি খালেদ। এ মামলায় ২০১৬ সালে ডিবি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তবে আদালত প্রতিবেদন গ্রহণ না করে স্বপ্রণোদিত হয়ে পিবিআইকে মামলার অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
ক্যাসিনোকাণ্ডে কয়েক দফা রিমান্ডের পর কারাগারে ছিলেন খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। গত ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে তার গুলশানের বাসা থেকে অস্ত্রসহ আটক করে র‌্যাব। পরদিন তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। এরপর কয়েক দফা রিমান্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

Post a Comment

0 Comments