সিএনজি অটোরিকশায় নম্বর নৈরাজ্য

মিটারে চলে না, যাত্রীর পছন্দমতো গন্তব্যে যেতেও চায় না, এমন অনেক অভিযোগই আছে সিএনজি অটোরিকশার বিরুদ্ধে। এসব নৈরাজ্যকেও ছাড়িয়ে গেছে অটোরিকশা বিক্রিতে নম্বর বাণিজ্যে। একটি নতুন সিএনজি অটোরিকশার দাম চার লাখ টাকা, কিন্তু অটোরিকশার কাগজের দাম ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা।
রাজধানী ও চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ক্রয়-বিক্রয়ে নম্বর বাণিজ্য নিয়ে চলছে এই নীরব নৈরাজ্য। বিআরটিএ থেকে নতুন করে সিএনজি অটোরিকশার নতুন রেজিস্ট্রেশন না দেয়ায় পুরনো সিএনজি অটোরিকশার মালিকরাই চালাচ্ছেন এই নম্বর বাণিজ্য। অভিযোগ আছে সবকিছু জেনে-বুঝেও চুপ করে আছে বিআরটিএ।
অথচ বিআরটিএ যখন রেজিস্ট্রেশন দিয়েছিল, তখন সিএনজি ট্যাক্সির দাম পড়ত সর্বোচ্চ চার লাখ ১৫ হাজার টাকার মতো। কিন্তু মেট্রো গাড়ির রেজিস্ট্রেশন না দেয়ার ফলে দাম বৃদ্ধি বলে জানিয়েছেন সিএনজি মালিকরা। এতে বেকায়দায় পড়েছে সাধারণ ব্যবসায়ীরা। বিআরটিএ বলছে, নতুন করে কোনো রেজিস্ট্রেশন দেয়া হচ্ছে না বলেই পুরনো মালিকরাই অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে।
জানা যায়, সিএনজি অটোরিকশার নম্বর প্লেট নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকায় নতুন করে রেজিস্ট্রেশন দেয়া বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ঢাকায় ১৩ হাজার ও চট্টগ্রামে ১৩ হাজার সিএনজির রেজিস্ট্রেশনের পর আর অনুমোদন দেয়া হয়নি। এরপর থেকে নগরীতে সিএনজি অটোরিকশার চাহিদা বৃদ্ধি পেলেও অনুমোদন দেয়নি বিআরটিএ।
অন্যদিকে পুলিশ, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও হাইকোর্টে নিলামকৃত অটোরিকশাগুলো বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। রেজিস্ট্রেশন না দেয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি চক্র ও কিছু শোরুম মালিক অতিরিক্ত দামে বিক্রি করে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ সিএনজি মালিকদের। কয়েকটি শোরুম ঘুরে দেখা গেছে, বাজাজ অটো’র নতুন একটি গাড়ির মূল্য মাত্র ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। যেহেতু বাজাজ অটো ডিলার ছাড়া সরাসরি গাড়ি বিক্রি করেন না। তাই ডিলার থেকে গাড়ি কিনতে খরচ পড়ে চার লাখ টাকার মতো। এরপর আছে রেজিস্ট্রেশন খরচ।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, একটি সিএনজি অটোরিকশা সরকারিভাবে রেজিস্ট্রেশন করতে খরচ হয় ১৩ হাজার ২০৫ টাকা। যার মধ্যে ট্যাক্স টোকেন ২৬৯৭ টাকা, আয়কর ৩০০০, ফিটনেস, ১০৮৭, ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন ৫৫৫, নম্বর প্লেট ২২৬০, নতুন রেজিস্ট্রেশন ১০২৫, রোড পারমিট ১১০৪ টাকাসহ আরো কিছু টাকা খরচ করতে হয়।
রাজধানীর একটি শোরুম থেকে জানা যায় কয়েকশ’ সিএনজি মালিক নম্বর বাণিজ্যর সাথে জড়িত। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মীরহাজীরবাগে আব্দুল হাই নামে একজন দালাল আছেন, যার জানা আছে নম্বর বিক্রি করতে চাওয়া শত শত মালিকের নাম। আব্দুল হাই জানান, নম্বরসহই নতুন একটি অটোরিকশা বিক্রি করতে চান মালিক। কিন্তু দাম শুনে ঘোর কাটতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। ২০০১ সালে বেবিট্যাক্সি ও টেম্পো তুলে দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ওই মালিকদের নামেই সিএনজি অটোরিকশা বরাদ্দ দেয় সরকার। রাজধানীতে চলছে ১৫ হাজার অটোরিকশা যার মালিক দুই থেকে আড়াই হাজার। আর এদের হাতেই নম্বর বাণিজ্য।
চালকদের দাবি, ন্যায্য দামে গাড়ি পাওয়া যায় না বলেই যাত্রী হয়রানি বন্ধ হচ্ছে না। তারা বলেন, এত টাকা দিয়ে সিএনজি কিনে মালিকরা ড্রাইভারদের ওপর সে টাকা তুলে আনার জন্য চাপ দেন। সে কারণে ড্রাইভাররা যাত্রীর কাছ থেকেই সে টাকা তুলে আনতে চান। চালকরা আরো বলেন, বিআরটিএর সহায়তা পেলে তারা মিটারে ভাড়া খাটতেই রাজি আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিএনজি অটোরিকশার মালিক বলেন, একটি পুরনো গাড়ি যদি কিনতে যান, তাহলে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকার নিচে কেউ বিক্রি করবে না, কারণ নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন না দেয়াতে পুরনো গাড়ির মূল্য বেড়ে গেছে। সেগুলো স্ক্র্যাপ করাতে গেলে ইঞ্জিন নম্বর চেসিস নম্বর সঠিক থাকলেও ২০ হাজার টাকা দালালকে দিতে হয়। আবার ইঞ্জিন নম্বর, চেসিস নম্বরে ঘষামাজা থাকলে দিতে হয়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আমাদের মধ্যে যার থেকে যেভাবে পেরেছে, সেভাবে টাকা নিয়েছে বিআরটিএর দালালরা। তা নাহলে স্ক্র্যাপ করতে দেয়নি। স্ক্র্যাপ হওয়ার পর নাম পরিবর্তন এবং রেজিস্ট্রেশন বাবদ আরো এক থেকে দেড় লাখ টাকা চলে যায়। তাহলে
গাড়িগুলোর মূল্য ১৩-১৪ লাখ টাকা হবে না কেন? যদি ঠিকমতো রেজিস্ট্রেশন দিতো তাহলে এমনটি হতো না।
আরেক সিএনজির মালিক বলেন, সিএনজি অটোরিকশার দাম বেশি হলেও এখনো এর চাহিদা অনেক। ধরুন, আমি যদি ১৫ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখি, তবে ব্যাংক আমাকে প্রতিমাসে সুদ দিবে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। তাহলে আমি যদি একই টাকা দিয়ে একটি সিএনজি কিনে নিই, তবে সেটি আমাকে প্রতিমাসে হালালভাবে দিবে ২৭ হাজার টাকা (প্রতিদিন ৯০০ টাকা করে)। তাহলে আমি যদি হালালভাবে ২৭ হাজার টাকা পাই, তবে খারাপ কোথায়? বর্তমানে যাদের কালো টাকা রয়েছে, তারা সবাই বেশি দাম দিয়ে সিএনজি অটোরকশা কিনছেন। ফলে নতুন করে সিএনজি অটোরিকশা কেনা আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতে যে ধরনের দুর্বৃত্তায়ন চলছে তা বন্ধে বিআরটিএকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে যাত্রী হয়রানি তো কমবেই না বরং এই নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। কোম্পানিভিত্তিক সমন্বিত সিএনজি অটোরিকশা সেবা চালুই হতে পারে এই নৈরাজ্য বন্ধের অন্যতম উপায়।
এ প্রসঙ্গে পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, একটা কোম্পানিকে ৫ হাজার সিএনজি দেয়া গেলে চালকের সাথে কথা বলার প্রয়োজন পড়ত না। মালিককে তারা বলতে পারত, নিয়ম না মানলে রুট পারমিট বাতিল করে দেব। আর তখনি সিএনজিচালকরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় মিটারে চলত। আর সিএনজির নম্বর বাণিজ্য নিয়ে বিআরটিএকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
যদিও বিআরটিএ বলছে, তাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি। বিআরটিএর রোড সেফটি পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, ক্রেতা-বিক্রেতা ইন্টারনালি যদি কেউ বিক্রি করে থাকে, আমাদের কাছে অভিযোগ দিলে অবশ্যই আমরা তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেব।
তিনি আরো বলেন, রাইড শেয়ারিং অ্যাপ সেবার কারণে সিএনজি অটোরিকশার চাহিদা কমেছে, তাই এখন ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকাতেই মিলছে এটি। কিন্তু এই অটোরিকশাই দু’বছর আগেও বিক্রি হয়েছে ১৮ লাখ টাকায়। সরকার যদি নতুনভাবে রেজিস্ট্রেশন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তখন আমরা নতুন করে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করব। এতে হয়তো সিএনজির নম্বর বিক্রির নৈরাজ্য থাকবে না।

Post a Comment

0 Comments