জামাল উদ্দিন (৭০)। তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক তিনি। ছোট ছেলে রেদওয়ান
শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধি। দূর্ভাগ্যক্রমে স্ত্রী লাইলী বেগমও মানসিক
প্রতিবন্ধি হয়ে পড়েছেন। বয়সের ভারে কর্মসক্ষমতা হারিয়ে বেকার অবস্থায় যেন মৃত্যুকে
স্বাগত জানাতে প্রস্তুত তিনি। দুই মেয়ের বিয়ে হলেও ১৬ বছরের তরুনী কন্যা ডালিয়াকে
বিয়ে দেননি এখনও। তাই দেড় বছর আগে ফতুল্লার দেলপাড়া পেয়ারা বাগান এলাকায় এক
প্রবাসীর বাড়ীতে গৃহকর্মীর কাজ নেয় এই তরুনী। এতেও ভাগ্য সহায় হয়নি তার। শুখের
আশায় প্রবাসীর বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নিলেও হিতে বিপরিত ঘটেছে মেয়েটির ভাগ্যে। বিগত
দেড় বছরের প্রতিটি সময়ই গৃহকর্তীর নির্মম নির্যাতনের খড়ক নেমেছে তার তারুণ্যে ভড়া
শরীরে। চুন থেকে পান খশলেই খুন্তি পুড়িয়ে ছ্যাঁকা দিয়ে শাস্তি দেয় হয় গৃহকর্মী
ডালিয়াকে। শরীরের নানা অঙ্গে ধারণ করেছে অসংখ্য পোড়া দাগ! মলিন মুখে করুণ চাহনিই
যেন বলে দিচ্ছে, হাসতে ভুলে যাওয়া মেয়েটির হৃদয়ের ক্ষতযে
আরো কতটা গভীর ! জানা গেছে, অভিযুক্ত গৃহকর্তীর নাম সেলিনা (৩৫)। তার
স্বামী মোঃ বাবু সৌদী আরবে থাকেন। ফতুল্লার দেলপাড়া পেয়ারাবাগান এলাকায় নিজস্ব ৫
তলা বিশিষ্ট ভবনের ২য় তলায় বসবাস করছেন তারা। নিজে দুই মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের
জননী হলেও মেয়ে সমতুল্য এক তরুণীকে এমন পাশবিক নির্যাতন করে চলেছেন দিনের পর দিন।
এদিকে এ ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন নির্যাতনের শিকার
গৃহকর্মী ডালিয়ার বাবা জামাল উদ্দিন। তিনি চাঁদপুরের ছেঙ্গারচর থানাধীন কলাকান্দা
ইউনিয়নের শানিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। মেয়েকে এমন নির্যাতনের খবরে গ্রামের বাড়ী
থেকে ফতুল্লায় ছুটে এসেছেন তিনি। অভিযোগে
বৃদ্ধ জামাল উদ্দিন বলেন, আমার ৩ মেয়ে ১ ছেলে। ছেলেটি মানসিক
প্রতিবন্ধি। স্ত্রী লাইলী বেগমও মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। আমি কর্মক্ষম না
হাওয়ায় আমার ছোট মেয়ে মোসাঃ ডালিয়া (১৬) দেলপাড়া পেয়ারা বাগান এলাকায় সেলিনা
বেগমের বাড়ীতে গৃহপরিচারিকার কাজে দেই। প্রায় দেড় বছর ধরে আমার মেয়ে ডালিয়া
অভিযুক্ত সেলিনার বাড়ীতে গৃহপরিচারিকার কাজ করছে। কিন্তু সেলিনা অত্যন্ত বদ মেজাজী
মহিলা। বিষয়টি আমাদের জানা ছিলোনা। দেড় বছর ধরে আমার মেয়েকে কারণে অকারণে অমানসিক
ভাবে নির্যাতন করে আসছে সেলিনা। সামান্ন কিছু হলেই লোহার খুন্তি পুড়িয়ে আমার মেয়ের
শরীরে ছ্যাঁকা নির্যাতন চালায় সে। এমনকি আমার মেয়ে যেন বাসা থেকে বেড়িয়ে যেতে না
পারে এবং প্রতিবেশীদের যেন জানাতে না পারে,
সে জন্য তাকে ঘরের
ভিতরে তালাবদ্ধ করে রাখত। আমার মেয়ের দুই হাতে,
পায়ে ও পিঠে
অসংখ্য পোড়া এবং কাটা জখম রয়েছে। মেয়ে কান্নাকাটি করলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিত।
সর্বশেষ গত সোমবার সকাল অনুমান ৯টার দিকে ফ্রিজে দুধ না রাখার মত তুচ্ছ ঘটনাকে
কেন্দ্র করে গৃহকর্তী সেলিনা আমার মেয়ের চুল ধরে মারধর করতে থাকে। কান্নাকাটি করায় সেলিনা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে
ধারালো বটি নিয়ে মেয়েকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোপ দেয়। কিন্তু আমার মেয়ে সরে যাওয়ায়
প্রাণে রক্ষা পায়। এরপর বটির ভোতা অংশ দ্বারা আমার মেয়েকে এলোপাথারী পিটিয়ে পিঠে
এবং হাত-দুই পায়ে মারাত্মক রক্তাক্ত জখম করে। বৃদ্ধ জামাল উদ্দিন বলেন, আমার মেয়ে ময়লা ফালানোর কথা বলে ওই বাড়ী থেকে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয়। পরে
আশপাশের প্রতিবেশীরা মেয়ের কাছ থেকে ঘটনা জানতে পেরে আমাকে ফোন করে। ঘটনা শুনে
ফতুল্লায় ছুটে আসি। তিনি আরো বলেন,
মেয়ের শরীরের কোন
স্থানই বাদ নেই। সর্বত্র পুড়ে পুড়ে কালো ক্ষত হয়ে রয়েছে। একজন মেয়ে মানুষ আরেক জন
মেয়েকে এভাবে নির্যাতন করতে পাড়ে ! আমি এর বিচার চাই। তাই থানায় লিখিত অভিযোগ
দিয়েছি। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে অভিযুক্ত সেলিনা বেগমের মোবাইল
নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোনের সংযোগ পাওয়া যায়নি। এবিষয়ে ফতুল্লা
মডেল থানার উপ-পরিদর্শক ফজলুল হক জানান, থানায় অভিযোগ দায়েরের পর আমাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
আমি অভিযুক্ত সেলিনার বাসায় গিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে বাসায় পাওয়া যায়নি। হয়ত
ভিক্টিমের থানায় আসার খবর পেয়ে সে পালিয়েছে। তবে,
আমরা অভিযান
চালিয়ে যাচ্ছি। তাকে আটক করে আইনের আওতায় আনা হবে।


0 Comments