জন্মদিন পালন করা হলোনা ওয়াজিদের


১২ বছরের ছোট্ট ছেলে ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদ। বাবা আব্দুল রুবেল ও মা কাকলী বেগমের প্রথম সন্তান। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পাড় হয়ে সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট বেলা থেকেই আরবি শেখায় তার প্রবল আগ্রহ। মায়ের নির্দেশনা অনুয়ায়ী সে তার খালা রুনার ঘরে আরবি শিক্ষক সোনিয়ার কাছে পড়তেন। প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত আরবি শিখেন। প্রতিদিনের মতোই পড়ার জন্য মা কাকলী বেগম পৌঁনে ৪ টায় তাকে আরবি পড়তে পাঠায়। কিন্তু এখনো ফিরেনি ওয়াজিদ। ২৪ ঘন্টা পরেও এক বুক আশা নিয়ে ছেলে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন কাকলী বেগম। কখন তার ছেলে তার বুকে ফিরবে। ফিরলো ওয়াজিদ। তবে একেবারে নিথরভাবে। ঘটনার প্রায় ৪৭ ঘন্টা পরে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টায় নারায়ণগঞ্জ শহরের  বাবুরাইল এলাকায়  খালের উপর ধসে পড়া এইচএম ম্যানশন নামের চারতলা ভবনটির নিচতলার ভেতর একটি ভিমের নিচে কাঁদাপানিতে চাপা পড়া অবস্থায় ওয়াজিদের মরদেহ সনাক্ত করে। পরে দেড় ঘন্টার প্রচেষ্টায় বিকেল সাড়ে ৩টায় ওয়াজিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের সহকারী উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন। তিনি বলেন, ধসে পড়া ভবনের দেয়াল কেটে ভেতরে ঢুকেও উদ্ধার অভিযানে ওয়াজিদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলনা। হয়তো সে ভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিলো। কাদামাটির কারণে পানির নিচে নেমেও অনুসদ্ধানে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। গত রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের বাবুরাইল এলাকাতে খালের উপর নির্মিত এইচএম ম্যানশন নামের ভবনটি ধসে পড়ে। এই ৪ তলা ভবনের নীচের তলায় আরবি পড়তে গিয়েছিলেন ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদ, তার খালাতো ভাই সোয়াইব ও সমবয়সী স্বপনা। তারা জানান, হঠাৎ করেই বাহির থেকে জোরে জোরে ডাক আসল ওয়াজিদ, সোয়াইর তোরা কই বাইরে আয়, জলদি আয়। ভিতরের সবাই বের হতে থাকে। দরজার কাছাকাছি গিয়ে আবারও নিজের কোরআন শরীফের টানে ঘরের ভিতরে যায়। এর মধ্যেই ধ্বসে পড়ে ভবনটি। ঘরের ভিতরে সবাই যখন পানির দিকে যেতে থাকে স্বপনা খাটের পায়া ধরে রাখে। সোয়াইরের উপর ভাড়ি জিনিস পড়ায় সে উঠতে পারে না, আর ওয়াজিদ গড়িয়ে বারান্দার দিকে যেতে থাকে। ওয়াজিদ স্বপনার হাত ধরলেও বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি। সে বারান্দার দিকে গড়িয়ে চলে যায়। ঘরের বারান্দার অংশটি খালের পানিতে ডুবে যায়। এরপর ফায়ার সার্ভিস এসে উদ্ধার কাজ চালিয়ে রোববার রাতেই সোয়াবের লাশ উদ্ধার করে। এবং বাড়ির ভিতরের অন্য ৭জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। কিন্তু পাওয়া যায়নি ইফতেকার আহমেদ ওয়াজিদকে। ওয়াজিদ তার খালা রুনা বেগমের ঘরেই আরবি পড়তো। ভবনটি ধসে পড়ার পূর্বে তিনি বাড়ির বাহিরে ছিলেন। ভবনের পিলার কিছুটা মাটি থেকে সড়ে পড়ছে লক্ষ করেই তিনি হৈচৈ শুরু করেন। বার বার নিজের দুই বোনের দুই ছেলের নাম ধরে ডাকছিলেন, ওয়াজিদ, সোয়াইব তোরা কই বাইরে আয়, জলদি আয়। তাদের না আসতে দেখে নিজেই ভবনের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকেন। কিন্তু ফটক দিয়ে ঢুকতেই ভবনটি ধ্বসে পড়েন। পরবর্তীতে তাকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করেন। ওয়াজিদের নিখোঁজের পর থেকেই তার মা আহাজারিতে বলতে থাকেন, আমার ছেলেরে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখছি। কখন আসবি তুই ওয়াজিদ। আমার ছেলেরে কেউ নিয়া আসো। আরবি পড়তে পাঠাইছিলাম। আমার  ছেলে কোরআন শরীফ খতম দিবো। আমার ছেলে তো আর আসে না। আমি ওরে ছাড়া বাঁচুম কেমনে? আমার তো এই একটাই মানিক। মানিক আমার কোরআন শরীফ রাইখা আসতে চায় নাই। ও মানিক তুই কই? এই মাসের ১৬ তারিখে জন্মদিন আমার মানিকের। আমারে কয়েকদিন যাবৎ বার বার বলতাছিল, ‘ওমা ওমা আমার কিন্তু জন্মদিন আইসা পড়ছে। সবাই গিয়ে আমার মানিকরে একটু আইনা দেও না! ওয়াজিদের লাশ উদ্ধারের খবরে আহাজারি থেমে স্তব্দ মা। অন্যদিকে ধসে পড়া ভবনটির উদ্ধার অভিযানের সামনে ছেলেকে ফিরে পেতে নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়েই ছিলেন ওয়াজিদের বাবা আব্দুল রুবেল। চারিদিকে হাক-ডাক হৈ চৈ। টলমলে দুটি চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ধসে পড়া ভবনটির দিকে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের র্কর্মীরা কাজ করছেন। ২ দিন পার হবার পরে ছেলেকে পেলেন। তবে এমনভাবে পেলেন যা পৃথিবীর কোন বাবার পক্ষেই মেনে নেওয়ার মত নয় এমন এক দৃশ্য।

Post a Comment

0 Comments