নন্দিত সাকিব নিন্দিত সাকিব

নন্দিত সাকিব যেন নিন্দিত! বিশ্বসেরা সাকিবের নিষেধাজ্ঞা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বড় এক ধাক্কা। তবে সাকিবের কাজটিকেও নিতান্তই হেয়ালি বলা চলে না। সাকিবের এ নিষেধাজ্ঞা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না সাকিব ভক্তরা। আর তাইতো এরইমধ্যে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সাকিবকে ফেরাও স্লোগান হতে দেখা গেছে কয়েক জায়গায়। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম ও বিসিবির সামনে বিক্ষোভ করেছেন ভক্তরা। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও।
কিন্তু অনেকে আবার সাকিবের নিন্দাও করেছেন। যেখানে একজন খেলোয়াড় অনেকের চোখে আদর্শ, সেখানে সাকিবের মতো একজন বিশ্বসেরা খেলোয়াড়ের কাজটি একদম সমালোচনা বিহীন না। যদিও ২০০৮ সালে আইসিএলে তারকা খেলোয়াড়দের চলে যাওয়া কিংবা ২০১৩ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলের ম্যাচ পাতানো ও স্পট ফিক্সিংয়ে ঘটনার চেয়ে সাকিবের ঘটনা দেশবাসীর কাছে বেশি আলোচিত তথাপি কিছু কিছু কারণে তিনি সমালোচিতও বটে।
বিশ্বসেরা সাকিব নানান সময়ে প্রশংসিত হয়েছেন বিশ্বব্যাপী। অনেক গুনি লোক সাকিবের প্রশংসা করেছেন। কিন্তু এবার যেন কিছুটা হলেও সমালোচনার মুখে পড়তে যাচ্ছেন সাকিব। কারণ একই ধরণের প্রস্তাব তিনবার পাওয়ার পরেও বোর্ড বা আইসিসিকে জানাননি তিনি। এতে কিছুটা সন্দেহের দানা বাঁধাটা অস্বাভাবিক কিছু না।
সাকিব প্রথমবার নিষিদ্ধ হয়েছিলেন ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কর্তৃক। সেবার শ্রীলংকার বিপক্ষে একটি ম্যাচে টেলিভিশন ক্যামেরার দিকে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করেন তিনি। এ ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। সে সময় সমালোচনার মুখে প্রথমে তাকে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ করে বোর্ড। পরে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করে বোর্ডের ডিসিপ্লিনারি কমিটি।
একই বছর আবারো শাস্তির কবলে পড়েন সাকিব। বোর্ডের শৃঙ্খলাভঙ্গ ও আচরণগত সমস্যার অভিযোগে ২০১৪ সালের ৭ জুলাই ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক সব ধরনের ক্রিকেটে ৬ মাস নিষিদ্ধ হন তিনি। এছাড়া পরবর্তী দেড় বছর দেশের বাইরে কোনো টুর্নামেন্টে খেলার জন্য তাকে এনওসি (অনাপত্তিপত্র) না দেয়ারও ঘোষণা দেয় বিসিবি। অবশ্য পরবর্তীতে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার শাস্তি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় ক্রিকেট বোর্ড। নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ৩ মাস কমানো হয়।
আর এবারের শাস্তির মুখে নানান কারণে বিতর্কিত সাকিব। অভিযোগের যেন কোনো কমতি নেই। তাছাড়া এরই মধ্যে সাকিবের শাস্তি আরো বেশি হওয়া উচিত ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন। তার মতে, সাকিবের ওপর দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা কম হয়ে গেছে। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক টুইটে মাইকেল ভন বলেন, ‘সাকিব আল হাসানের জন্য কোনো দয়া দেখানোর সুযোগ নেই। সে যেই হোক। বর্তমান সময়ের খেলোয়াড়দের সব সময়ই জানানো হয় যে, তারা কি করতে পারবে আর কি করতে পারবে না। কোন বিষয়ে সরাসরি রিপোর্ট করতে হবে, সেটাও বলে দেয়া হয়। … দুই বছর একেবারেই যথেষ্ট নয়। অবশ্যই আরো লম্বা শাস্তি প্রয়োজন ছিলো।’
আইসিসি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাকিবের অপরাধের ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘একটি চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে দীপক আগারওয়াল নামের এক ব্যক্তির ব্যাপারে জানতে সাকিব আল হাসানকে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী বিভাগ।’ আগারওয়াল নামের সে ব্যক্তি ক্রিকেট দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং আইসিসির চোখে সন্দেহভাজন। এ তদন্তেই সাকিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী আইনের ২.৪.৪ ধারায় তিনটি অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছে।
২.৪.৪ ধারা যে অপরাধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে
দুর্নীতি দমন আইনের অধীনে অনৈতিক আচরণে জড়িত হওয়ার আমন্ত্রণের কথা আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী বিভাগের কাছে (অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে) প্রকাশ করতে ব্যর্থ হওয়া।
২.৪.৪ ধারায় এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা হয়েছে
এটা অনস্বীকার্য যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ ধরনের সব অনৈতিক প্রস্তাব যত দ্রুত সম্ভব কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব আইসিসির দুর্নীতিবিরোধী বিভাগ ও অন্যান্য দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান, যারা খেলাটির নৈতিকতা রক্ষার চেষ্টা করছে তার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। এটা ঠিক ‘অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব’ ছিলো কি না, সেটা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আলাদাভাবে বিচার করা হবে। একটি নির্দিষ্ট ম্যাচে যদি কোনো খেলোয়াড় দুর্নীতির প্রস্তাব পায় এবং সেটি দুর্নীতি বিভাগকে জানাতে সে যদি ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না (এবং ‘অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব’ বলে গণ্য হবে)।
দুর্নীতি দমন বিভাগের ৬.২ ধারা অনুযায়ী ২.৪.৪ ধারায় সর্বনিম্ন ছয় (৬) মাস থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ (৫) বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানকে দুই বছর (এর মাঝে স্থগিত শাস্তি এক বছর) শাস্তি দেওয়ার পেছনে এ বিষয়টি ভূমিকা রেখেছে।
সাকিবের শাস্তি ছয় মাস থেকে বেড়ে যাওয়ার কারণ
১) আগারওয়ালের কাছ থেকে তিনবার প্রস্তাব পেয়েও কর্তৃপক্ষকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
২) আগারওয়ালের সঙ্গে সাকিবের সাক্ষাতের বিষয়টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বেশ দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে।
৩) সাকিব আল হাসানের সঙ্গে যেভাবে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো, তাতে উদ্দেশ্য পরিষ্কার বোঝা গেছে। সাকিব পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলেন আগারওয়াল তাঁর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে জুয়ার কাজে তা ব্যবহার করবে।
৪) সাকিব একজন অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার। তিনি অনেকবারই দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং এ ধারায় তাঁর কর্তব্য খুব ভালোমতোই জানেন।
৫) বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে সাকিব বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।
সাকিবের সর্বোচ্চ শাস্তি না পাওয়ার কারণ
১) সাকিব নিজ থেকে সব দায় মেনে নিয়েছেন এবং তদন্তের সময় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন।
২) নিয়ম ভাঙার নোটিশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায় স্বীকার করে নিয়েছেন।
৩) দুর্নীতিবিরোধী বিভাগের কাছে সাকিব অনুশোচনা করেছেন এবং অনুতপ্ত হয়েছেন।
৪) সাকিবের অতীত আচরণ।
৫) ওই নির্দিষ্ট ম্যাচগুলোয় ওই ঘটনায় আর্থিক কোনো ক্ষতি হয়নি, মানুষের আগ্রহেও ঘাটতি দেখা যায়নি।
৬) ওই ঘটনায় খেলার ফলে কোনো প্রভাব পড়েনি।
এছাড়া আইসিসির অভিযোগে আরো জানা যায়, আগারওয়ালের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে কয়েকবার মেসেজও চালাচালি হয়েছে সাকিবের। ২০১৮ সালের জানুয়ারি জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজের দলে ডাক পান বাঁহাতি অলরাউন্ডার। এই সিরিজেও হোয়াটসঅ্যাপে তাদের সঙ্গে কথোপকথন হয়। ওই বছর ১৯ জানুয়ারির ম্যাচে ম্যাচসেরা হওয়ার পর সাকিবকে অভিনন্দন জানান আগারওয়াল। সেখানে একটি বার্তা ছিলো, ‘আমরা কী কাজ শুরু করবো নাকি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করবো।’ কাজ বলতে বোঝানো হয়েছে, দলের ভেতরের তথ্য তাকে দেওয়ার কথা। এই যোগাযোগের কথা দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটের কাছে গোপন করেন সাকিব।
চার দিন পর ২৩ জানুয়ারি আবারও আগারওয়াল হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে আরেকটি প্রস্তাব দেন, ‘ব্রো, এই সিরিজে কিছু হবে?’ সাকিব স্বীকার করেছেন, ওই ত্রিদেশীয় সিরিজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভেতরের তথ্য তাকে সরবরাহ করতে এই বার্তা দেন আগারওয়াল। এই প্রস্তাবও গোপন করেন সাকিব।
২৬ এপ্রিল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের বিপক্ষে আইপিএল ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের সঙ্গে ম্যাচ খেলার সময় তৃতীয়বার প্রস্তাব পান সাকিব। ওইদিন তার কাছে আগারওয়াল জানতে চান একটা নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের ব্যাপারে যে তিনি খেলবেন কিনা ওই ম্যাচে। এরপর আরও ভেতরের খবর জানতে চান ওই জুয়াড়ি। কথা আরও চালিয়ে যান আগারওয়াল। একপর্যায়ে সাকিবের বিটকয়েন, ডলার অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানতে চান তিনি। ডলার অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত জানতে বেশি তোরজোড় করেন আগারওয়াল। এপরই সাকিব তাকে বলেন, ‘আগে’ তার সঙ্গে দেখা করতে চান তিনি।
ওইদিনের বেশ কয়েকটি মেসেজ ডিলিট করা হয়েছিলো। সাকিব নিশ্চিত করেন, ভেতরের খবর জানতে চেয়েই ছিলো ওই মেসেজগুলো। আগারওয়ালকে নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন সাকিব। এই কথোপকথনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আগারওয়াল একজন জুয়াড়ি। কিন্তু তৃতীয় প্রস্তাবেও দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে জানাননি সাকিব।
ওইদিনের বেশ কয়েকটি মেসেজ ডিলিট করা হয়েছিলো। সাকিব নিশ্চিত করেন, ভেতরের খবর জানতে চেয়েই ছিলো ওই মেসেজগুলো। আগারওয়ালকে নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন সাকিব। এই কথোপকথনে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আগারওয়াল একজন জুয়াড়ি। কিন্তু তৃতীয় প্রস্তাবেও দুর্নীতি বিরোধী ইউনিটকে জানাননি সাকিব।

Post a Comment

0 Comments