সীমানা ছাড়িয়ে সুগন্ধি নাগা মরিচ

সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত নাগা মরিচ দু-তিন বছর ধরে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে। প্রবাসী বাঙালিরাই এ মরিচের প্রধান ভোক্তা। ২০১১ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রফতানি শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যেও
ভারতীয় রন্ধনশিল্পে মরিচ একটি অত্যাবশ্যকীয় মসলা। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একসময় মূলত শুকনা মরিচের ব্যবহার ছিল। পাকা মরিচ শুকিয়ে শিলপাটায় বেটে বা ঢেঁকিতে গুঁড়ো করে ব্যবহার করা হতো। তবে গ্রাম-শহর সবখানেই এখন সব ধরনের রান্না বা মুখরোচক খাবারে কাঁচামরিচই ব্যবহার করা হয়। দেশে বিভিন্ন জাত-উপজাতের মরিচ রয়েছে। যে মরিচ নিয়ে এখানে আলোচনা করা হচ্ছে সেটি বিশেষ। নাগা মরিচ, বোম্বাই মরিচ, কামরাঙা মরিচ, ভূত মরিচ, রাজা মরিচ, নাগাহরি, সাপের বিষ মরিচ আরো নানা নামে এটি পরিচিত। তবে প্রধানত নাগা মরিচ নামেই বিশ্বব্যাপী এটির খ্যাতি।
দেশে মোটামুটি সব এলাকায় নাগা মরিচের চাষ হয়। অনেকে শখ করে বাড়িতে দুয়েকটি গাছ লাগান। তবে ইদানীং বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের নাগা মরিচ রফতানিও হচ্ছে। সিলেটের জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বাণিজ্যিকভাবে চাষকৃত নাগা মরিচ যাচ্ছে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে।
দেশী মরিচের অনেক জাত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বগুড়ার বোনা, বাইন, বাইটা, বালিঝরা, তরণি, নয়মাইল, জালশুকা, দীঘলা, মানিকগঞ্জের বিন্দু, কুমিল্লার ইরিমরিচ, মিঠামরিচ, নরসিংদীর বাওয়ামরিচ, পাবনার হলেন্দার, কুষ্টিয়ার গোলমরিচ, আলমডাঙ্গা মরিচ, মাগুরার টেঙ্গাখালি, জামালপুরি, মাঠউবদা, কামরাঙ্গা, ঘৃতকুমারী, লতামরিচ, কালি, পাটনাই, পাবনা জাত, বামনি ঝাল, বারমাসি, বোম্বাই, দুধমরিচ, বহুবর্ষজীবী, ধানী, সূর্যমুখী, বারোমাসি, পবা স্পেশাল, শিকারপুরী, পাটনাই মৌসুমি রোপা মরিচ।
নাগা মরিচের তেমন বেশি জাত নেই। তবে আকার ও গন্ধভেদে কয়েকটি জাত রয়েছে। এছাড়া গবেষকরা নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। হাইব্রিড নাগা মরিচও রয়েছে। ২০০৮, ২০০৯-এর দিকে কিছু নাগা মরিচের হাইব্রিড জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে 7 Pot Jonah, Trindad Douglah, 7 Pod Primo, Scorpion Morouga, 7 Pot Barrackpore, Chocolate Devils Tongue। যদিও বাংলাদেশে নাগা মরিচ নিয়ে বিশেষ গবেষণা হয়নি।
নাগা মরিচ চাষ
নাগা মরিচ শীত-গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমেই চাষ করা যায়। ফসলের প্রাথমিক অবস্থায় অল্প বৃষ্টিপাত এবং ফসলের বৃদ্ধিকালীন পরিমিত বৃষ্টিপাত হলে ফলন ভালো হয়। ফলের পরিপক্বতার সময় শুকনো আবহাওয়া থাকলে গুণগতমান ও রঙ অক্ষুণ্ন থাকে। উর্বর দোআঁশ মাটি চাষাবাদের জন্য বেশি ভালো। অম্ল মাটিতে মরিচের চাষ করা গেলেও ক্ষারীয় মাটিতে ফলন ভালো হয় না। ছায়ামুক্ত ও বৃষ্টির সময় পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু জমি মরিচ চাষের উপযোগী। বন্যাবিধৌত পলি এলাকায় মাঝারি ও উঁচুভিটা যেখানে বর্ষার পর ভাদ্র অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন জো আসে সেখানে মরিচ ভালো হয়। বিশেষ করে সেচ এলাকায় অথবা নদী, নালা, খাল বা দীঘির আশপাশে, বাগানের রাস্তা, পানের বরজ, লেবু কমলা, পেঁপে, কলাসহ অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল ফল বাগান, সবজি বাগানের পাশে, ঘরের কাছে, উঁচু ভিটায় নাগা মরিচ চাষ করা যায়। উঁচু করে মাটি তুলে প্লট বানিয়ে নাগা মরিচের চারা রোপণ করতে হয়। আগেই বীজতলায় পলিথিনে চারা তৈরি করে নিতে হবে। সরাসরি বপন করেও আবাদ করা যায়। তবে এতে বীজের অপচয় হয়, ফুল আসতে সময়ও বেশি লাগে।
যত্নআত্তি
সাধারণত শীতকালে নাগা মরিচের চারা রোপণ করা হয়। তবে সতর্কভাবে লাগালে সারা বছরই রোপণ সম্ভব। সারের পরিমাণ সাধারণ মরিচের মতোই। তবে গাছ বড় এবং বেশিদিন বাঁচে বলে প্রতি বছর সার দিতে হয়। চারা লাগানোর দেড় থেকে দুই মাস পর থেকেই ফুল ধরে এবং ফুল আসার এক মাসের মধ্যে মরিচ খাওয়ার উপযোগী হয়।
নাগা মরিচের বাজার সম্ভাবনা
সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত নাগা মরিচ দু-তিন বছর ধরে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রফতানি হচ্ছে। প্রবাসী বাঙালিরাই এ মরিচের প্রধান ভোক্তা। ২০১১ সালের জুলাইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মরিচ রফতানি হচ্ছে যুক্তরাজ্যে। বৃহত্তর সিলেটের নাগা মরিচ এখন যুক্তরাজ্যের লন্ডন সিটির বিখ্যাত চেইন শপ টেসকোতে পাওয়া যায়।

Post a Comment

0 Comments